গত এক সপ্তাহে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি দিয়ে জাহাজ চলাচল চার গুণেরও বেশি বেড়েছে। সমুদ্র বাণিজ্যের নিরাপত্তা নিয়ে কিছুটা আস্থা তৈরি হওয়ায় শিপিং কোম্পানিগুলো এ রুটে পুনরায় জাহাজ পাঠাতে শুরু করেছে। খবর এফটি।
সামুদ্রিক তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সিগন্যালের সাতদিনের গড় তথ্য অনুযায়ী, সংকটের সময় প্রণালিটি দিয়ে প্রতিদিন একটি বা দুটি জাহাজ যাতায়াত করেছে। কিন্তু গত ১ জুলাই সে সংখ্যা বেড়ে দৈনিক আটটিতে পৌঁছেছে।
বিশ্বের অন্যতম বড় কনটেইনার শিপিং কোম্পানি হ্যাপাগ-লয়েড জানায়, পারস্য উপসাগরে আটকে থাকা চারটি জাহাজ এখন মুক্ত হয়ে বেরিয়ে এসেছে। অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান মায়েরস্ক বলছে, গত সপ্তাহে দুটি জাহাজ এ প্রণালি পার হতে পেরেছে।
প্রতিবেদন বলছে, তবে জাহাজ চলাচলের সংখ্যা যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় এখনো অনেক কম। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩৫টি জাহাজ এ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করেছে। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়েই পরিবহন করা হয়।
অবশ্য ঝুঁকি যে পুরোপুরি কেটে গেছে, তা নয়। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর ইরান দুটি জাহাজে আঘাত করেছে বলে উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। তা সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজের যাতায়াত বাড়ছে। লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের তথ্যানুযায়ী, ২৮ জুন পর্যন্ত এক সপ্তাহে উপসাগরে প্রবেশ ও প্রস্থানকারী জাহাজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫৮টিতে। মার্চে সংকট শুরুর প্রথম সপ্তাহে এ সংখ্যা ছিল ৪১।
কাতারের রাজধানী দোহায় গত মঙ্গলবার ও বুধবার এ নৌপথ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, কাতার ও ইরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা হয়। তবে জলপথটি পুরোপুরি উন্মুক্ত করার বিষয়ে বড় কোনো অগ্রগতি হওয়ার লক্ষণ দেখা যায়নি। তাছাড়া আন্তর্জাতিক ম্যারিন অর্গানাইজেশন (আইএমও) জানায়, হরমুজ প্রণালির প্রধান দুটি নৌপথে ইরান মাইন পেতে রেখেছে। পথটি পুরোপুরি নিরাপদ করতে অন্তত ৮০টি মাইন অপসারণ করা প্রয়োজন। মাইন থাকায় জাহাজগুলো এখন ভিন্ন পথ ব্যবহার করছে।
কিছু জাহাজ ইরানের নির্ধারিত রুট ব্যবহার করছে, যার জন্য ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। আবার কিছু জাহাজ ওমানের উপকূলঘেঁষে দক্ষিণ দিকের রুট ব্যবহার করছে।
শিপিং কর্মকর্তারা জানান, ওমান রুট ব্যবহারকারী জাহাজকে যুক্তরাষ্ট্র ও ওমান বিমান প্রতিরক্ষা সুবিধা দিচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে গত সপ্তাহে যাতায়াত করা জাহাজের বেশির ভাগই ছিল তেলবাহী ট্যাংকার। এসব জাহাজ মূলত যুদ্ধ শুরুর আগে উত্তোলিত তেল বহন করছে, যা এতদিন সাগরে ভাসমান অবস্থায় জমা রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে ৬০টিরও বেশি জাহাজ ছিল ইরানের।
ইরানের প্রধান মধ্যস্থতাকারী মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ জানান, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহারের পর ইরান চার কোটি ব্যারেল তেল রফতানি করেছে। এ তেল যুদ্ধপূর্ব সময়ের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি করা হয়েছে। এছাড়া উপসাগরীয় অন্যান্য দেশের তেল সরবরাহও বেড়েছে।
এদিকে আবুধাবির জাতীয় তেল কোম্পানি অ্যাডনকের বেশ কয়েকটি ট্যাংকার গত বুধবার ওমান রুট ব্যবহার করে একসঙ্গে এ প্রণালি পার হয়েছে। এ পরিস্থিতির ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারে।
ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম গত সপ্তাহে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রথমবারের মতো আগের স্বাভাবিক স্তরে নেমে এসেছে। তবে বাজারে ট্যাংকারের ব্যাপক চাহিদা ও সরবরাহের ঘাটতির কারণে গত ২৩ জুন হরমুজ রুটে একটি ট্যাংকার ভাড়ার স্পট রেট প্রতিদিন ৫ লাখ ডলারে পৌঁছায়, যা এপ্রিলের পর সর্বোচ্চ। জাহাজ চলাচল বাড়ায় ১ জুলাই এ ভাড়া কমে দৈনিক ২ লাখ ৯৪ হাজার ডলারে নেমে আসে।
বীমা ব্রোকার প্রতিষ্ঠান ডব্লিউটিডব্লিউর জেমস রিজন জানান, যুদ্ধবিরতির সময় জাহাজের বীমা প্রিমিয়াম ছিল এর মূল্যের ৭ শতাংশ, যা এখন কমে প্রায় ২ শতাংশে নেমে এসেছে।
উল্লেখ্য, গত এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়। পরবর্তী সময় জুনে উভয় দেশের রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরে একটি সমঝোতা স্মারকও সম্পাদিত হয়।